অবাধে চলছে অবৈধ ইটভাটা বায়ুদূষণ কোমাতে পোড়ামাটির বদলে ব্লক ইট

অবাধে চলছে অবৈধ ইটভাটা। বায়ু দূষণ পাশাপাশি কৃষি জমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে ইট। সরকার আগামী পাঁচ বছরে নির্মাণ কাজে ধাপে ধাপে পরিবেশবান্ধব ইটের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, একটা কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে। এটা ধাপে ধাপে আমরা বাস্তবায়ন করব। আমাদের টার্গেট ২০২৫ সাল পর্যন্ত।

চলতি অর্থবছরে ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে শুরু করে পরবর্তীতে তা আরও বাড়িয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাবে বলে জানান তিনি।

“ইতোমধ্যে বায়ু দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। সভার পরই প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়। অধিদপ্তর জনসচেতনতা তৈরির জন্য গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করেছে।”

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসেবে বাংলাদেশে বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস ইটভাটা থেকেই প্রায় ৫৮ শতাংশ দূষণ ঘটছে। আর এ দূষণ রোধে আদালতের আদেশে দূষণবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট ব্যবহারের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইনের ক্ষমতা বলে মাটির ব্যবহার ধীরে ধীরে কমানোর উদ্দেশ্যে সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কার কাজে ভবনে দেয়াল, সীমানা প্রাচীর, হেরিং বোন বন্ড রাস্তা এবং গ্রাম সড়ক টাইপ ‘বি’ এর ক্ষেত্রে ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ব্যবহারে কর্মপরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা বাধ্যতামূলক করা হল।
তবে সড়ক, মহাসড়কের বেইজ ও সাব-বেইজ নির্মাণ, মেরামত, সংস্কারে এ নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না বলেও জানানো হয় ওই প্রজ্ঞাপনে।

ইটভাটায় প্রচলিত পদ্ধতিতে কাঠ-কয়লা পুড়িয়ে ইট তৈরিতে পরিবেশের ‘বেশ ক্ষতি হচ্ছে’ বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

পরিবেশের উপর পোড়ামাটির ইটে ও ব্লক ইটের প্রভাব বোঝাতে তারা বলেন, পোড়ামাটির ইটে কৃষিজ জমির বিশেষ করে টপ সয়েল নষ্ট হচ্ছে, ছাই-ধোঁয়ায় আশপাশের সবাই নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

“কিন্তু ব্লক ইট তৈরিতে নির্ধারিত মেশিনের মাধ্যমে উৎপাদন করে শুকানো হয়। এতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হওয়ায় দূষণ অনেকাংশেই কম হবে।”

ইটের বদলে ‘ব্লক’ ব্যবহার উৎসাহিত করতে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন-২০১৯ এ বছর সংসদে পাস হয়।

ব্লক ইট তৈরির প্রক্রিয়া শুরুর পর ইটভাটাগুলো নির্দেশনা অনুসরণ করছে কি না তা সময়ে সময়ে তদারকি করা হবে বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

অধিদপ্তর বলছে, অবৈধ ইট ভাটা উচ্ছেদে ইতোমধ্যে পাঁচ জেলায় ক্র্যাশ অভিযান শুরু হয়েছে। বাকি সব বিভাগেও এই অভিযান চলবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, “দূষণ নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “ইটভাটা আট হাজারের মতো রয়েছে। বৈধ রয়েছে পাঁচ হাজারেরও কিছু বেশি। কিন্তু এনভায়রনমেন্ট ফ্রেন্ডলি ওয়েতে চলে চার হাজারের মতো ইটভাটা।

“কিছু ইটভাটা রয়েছে, যেগুলোর বিষয়ে হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এগুলোকে বৈধ-অবৈধ তালিকায় রাখা হয়নি। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, কিছু ছাত্রপত্র ছাড়া চলছে, কিছু বন্ধ রেখেছি।”

আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, “ইটভাটায় যাতে পরিবেশ দূষণকারী পদার্থের নির্গমন বন্ধ হয় তা নিশ্চিত করা হবে।“

দেশের ৬৪ জেলায় বর্তমানে ৮ হাজার ৩৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে ৫ হাজার ২২৫টি। ছাড়পত্র নেই ২ হাজার ৫১৩টি ইটভাটার।

অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ৫ হাজার ৭৯৮টি ইটভাটা। আর পরিবেশসম্মত চিমনি ব্যবহারে ইট তৈরি করছে ৭২ শতাংশ ইট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।

অবৈধ ইট ভাটা উচ্ছেদে প্রাথমিকভাবে ঢাকা ও সংলগ্ন জেলাগুলোয় উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব বিভাগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলবে।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ এলাকায় যেসব ইটভাটা অবৈধভাবে বা পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে চলছে এই ভাটা গুলো। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সেগুলোকে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

পরিবেশ অধিদপ্তর পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী হাকিম বলেন, “২৮ অক্টোবর থেকে এক মাসে ঢাকা ও আশপাশে পরিবেশ দূষণের দায়ে অন্তত ১০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়।

“ইতোমধ্যে ধামরাইয়ে চারটি ইটভাটাকে ৪৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ফার্মগেট এলাকায় দূষণের জন্য মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ঠিকাদারকে জরিমানা করা হয়েছে।”

ঢাকায় দূষণ কম ছিল রোববার

২৫ নভেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী বলেন, “ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনকে প্রতিদিন সকাল ও দুপুর দুইবার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় উপর থেকে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিআরটি ও মেট্রোরেল প্রকল্পকেও নিজস্ব উদ্যোগে পানি ছিটানোর অনুরোধ করা হয়েছে।”

পরদিন আদালত বলেছে, “রাজধানীর যেসব জায়গায় উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ চলছে, সেসব জায়গা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এমনভাবে ঘিরে ফেলতে হবে, যাতে শুকনো মৌসুমে ধুলো ছড়িয়ে বায়ু দূষণ বাড়তে না পারে।”

পাশাপাশি ‘ধুলোবালি প্রবণ’ এলাকাগুলোতে দিনে দুইবার করে পানি ছিটাতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, “নভেম্বরের তুলনায় রোববার ১ ডিসেম্বর বায়ু মান ছিল তুলনামূলক ভালো। আমাদের উদ্যোগের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। আমাদের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন সংস্থাও কাজ করছে।

“যেদিন বৃষ্টিপাত বাড়ে ও আকাশে মেঘ থাকে তখন এমনিতে কমে যায়। বেশি রোদেলা থাকে, বাতাস বেশি সেদিন বেড়ে যায়। এটা ন্যাচারাল। পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানও ঢাকায় অব্যাহত থাকবে।”

No Comments

Post A Comment