করোনার কারণে বিপর্যস্ত দেশের কাঁকড়া ও কুঁচে রপ্তানি

করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্ববাণিজ্যে পড়ছে বিশেষ প্রভাব। এই প্রভাব থেকে বাদ পড়ছে না বাংলাদেশ। আমদানী ও রপ্তানিমুখী বিভিন্ন খাতের পণ্য উৎপাদন নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে চীন থেকে যে সব কাঁচামাল আমদানী করা হতো তা এখন বন্ধ। এর সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানি হয় এমন দেশগুলোতেও করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে থাকায় রফতানিতেও পড়েছে বিশেষ প্রভাব। ঢাকার অদুরে উত্তরার কাছে নলভোগ এলাকা। যে এলাকা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রফতানির আগে প্যাকিংয়ের জন্য আনা হয় কাঁকডা এবং কুঁচে মাছ। এয়ারপোর্টের কাছেই এই এলাকায় প্রায় ৬০টির মতো এমন কাঁকড়া ও কুঁচে প্যাকিং সেন্টার গড়ে উঠেছে এখানে। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো এলাকা ঘুরে অবশ্য মাত্র ১০/১২টি প্যাকিং সেন্টার চালু থাকতে দেখা গেলো। আর বাকী সব বন্ধ। যেগুলো চালু আছে সেগুলোতেও কাঁকড়া নেই বললেই চলে। কাঁকড়া ও কুঁচে রফতানিকারকদের এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান গাজী আবুল কাশেম জানান, গত জানুয়ারির ২৫ তারিখ থেকেই এই অবস্থা চলছে। কারণ এসব কাঁকড়া ও কুঁচের ৯০ শতাংশই রপ্তানি হয় চীনে। কিন্তু চীনের এখন সব রপ্তানি বন্ধ। তিনি বলছিলেন, বছরে আমাদের রপ্তানির বেশিরভাগটাই হয় জানুয়ারি-ফেব্রæয়ারি মাসে। চীনা নববর্ষের কারণে এর চাহিদা বেশি থাকে। আমাদের ব্যবসায়ীরা প্রায় ৪শ কোটি টাকার কাঁকড়া ও কুঁচে রেডি করে রাখছিলো। এই করোনা আতঙ্কের কারণে সব নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, এই ক্ষাতে ব্যবসায়ীদের অনেকেই মূলধন হারিয়ে ফেলেছেন। এখান সরকার থেকে অর্থ সাহায্য ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব হবে। শুধু কাঁকড়া ও কুঁচে অনেক ক্ষেত্রেই কাঁচামাল আমদানীও কমেছে।

অন্যদিকে
করোনা ভাইরাসের কারণে বাংলাদেশ থেকে কাঁকড়া ও কুঁচে আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে চীন। ফলে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের উপক‚লীয় এলাকার খামারে উৎপাদিত কাঁকড়া ও ক‚ঁচে বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এ এলাকার উৎপাদিত কাঁকড়া ও কুঁচে নিয়ে বিপাকে পড়েছে প্রায় ২৫ হাজারের বেশি ব্যবসায়ী।
মৎস্যমাণ নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্র জানায়, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় ১৯৭৭ সালে নাম ওঠে কাঁকড়ার। ওই বছর দেশ থেকে মাত্র দুই হাজার ডলারের কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছিল। চলতি অর্থ বছরের (২০১৯-২০) প্রথম পাঁচ মাসে কাঁকড়ার রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৫৮০ কোটি টাকায়। অপরদিকে চলতি অর্থ বছরের একই সময় কুঁচে রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার। রপ্তানি হওয়া এসব কাঁকড়া ও কুঁচের ৮৫ ভাগের বেশি রপ্তানি হয় চীনে। কিন্তু চীনে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর গত ২৫ জানুয়ারি থেকে কাঁকড়া ও কুঁচে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উদ্ভুত পরিস্থিতি চলতে থাকলে কোনো কোনো ব্যবসায়ী অল্প দিনের মধ্যে দেওলিয়া হতে পারেন।

খামারিরা জানান, খুলনা অঞ্চলের প্রায় ২৫ হাজার ছোট-বড় খামারে কাঁকড়া ও কুঁচের চাষ হয়। ¯^াভাবিক সময় প্রতিদিন এসব খামার থেকে ২৫ টন কাঁকড়া ও ১০ টন কুঁচে ঢাকার রপ্তানিকারকদের কাছে পাঠানো হয়। এখন এই কাঁকড়া ও কুঁচে খামারে মজুদ রয়েছে। ইতোমধ্যে খামারের ৮০ ভাগ কাঁকড়া ও কুঁচে মারা গেছে। যে কাঁকড়া কেজি প্রতি ১৮০০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হতো, সেই কাঁকড়া এখন ৩০০ টাকা কেজি দরেও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে খামারিরা কর্মচারীদের বেতনও দিতে পারছে না।
বাগেরহাট কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ মনিরুজ্জামান জানান, চীনে কাঁকড়া রপ্তানি বন্ধ থাকার কারণে আমাদের এ অঞ্চলের খামারিরা কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু রপ্তানি বন্ধ ও খামারে পণ্য নষ্ট হওয়ায় কোনো ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে এই ব্যবসায় সম্পৃক্তরা পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
খুলনা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক আলম সিদ্দিকী জানান, জীবিত কাঁকড়া ও কুঁচে রপ্তানি নিয়ন্ত্রিত হয় ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকে। আমাদের খুলনা কার্যালয়ে এ সম্পর্কিত কোনো তথ্য নেই। ফলে এ সম্পর্কিত ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ লবস্টার চিংড়ি ও কাঁকড়া আমদানিকারক চীন। ২০১৯ সালে সারা বিশ্ব থেকে চীন মোট ১২ হাজার ৬০০ টন লবস্টার জাতীয় বড় চিংড়ি আমদানি করে।

No Comments

Post A Comment